Romantic Premer Golpo (রোমান্টিক প্রেমের গল্প) Read Online Free – Best Romantic Bangla Golpo

sudiproy877
32 Min Read

Romantic Premer Golpo

অপেক্ষা 
(১)
মনমেজাজ এমনিই খারাপ ঋতুর, সরস্বতী পুজোর আগে লাস্ট থিওরি পেপার ছিল কিন্তু পরীক্ষাটা মনমতো হয়নি। এরকম নয় যে ওর প্রস্তুতি ঠিক ছিল না বরং বলা যায় এই পেপারটাতেই ও সবচেয়ে বেশি কনফিডেন্ট ছিল কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। মোটামুটি সবটাই নামিয়ে এসেছে কিন্তু সেই ফিল গুড ব্যাপারটাই আসছে না। ছোটবেলা
থেকে এই জিনিসটা হয়ে এসেছে, যেকোনো ক্ষেত্রে ও যখন নিজের সবটা দিতে পারে না ওর মনের ভেতরে খচখচ করতেই থাকে। ঘরে ফিরে এসে ব্যাগটা সোফায় রেখে ও ঢুকলো ফ্রেশ হতে। বাড়ির সর্বক্ষণের সৌমিদি মেয়ের এই মুখচোখ বিলক্ষণ চেনেন, তাই তিনি বেশি ঘাঁটালেন না, একটা জিনিস দেওয়ার ছিল, কিন্তু থাক…..


বাথরুম থেকে বেরিয়েই ওর চোখ পড়লো বিছানায়, একটা পার্সেল রাখা, কিছুক্ষণ আগেও ছিল না ওখানে। তোয়ালে দিয়ে হাত পা মুছে ও ভাবলো কিছুক্ষণ, কিছু তো অর্ডার দেয়নি ও, বাবার কিছু? কিন্তু প্যাকিং এর বাইরে তো ওরই নাম লেখা। কাগজটা ছিঁড়তেই তার ভেতরে আরো একটা গিফট পেপারে মোড়ানো প্যাকেট বেরিয়ে আসলো, নাহ কারোর কোনো অর্ডার নয়, কেউ পাঠিয়েছে এটা। কিন্তু কে পাঠাতে পারে? ওর জন্মদিন মিটে গেছে গত ডিসেম্বরেই, এইভাবে তো কেউ কিছু পাঠায়নি এর আগে। গিফট পেপারটা খুলতেই একটা শাড়ি বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে, বাসন্তী রঙের। শাড়িটা দেখে ও যতটা না খুশি হলো তার থেকেও বেশি একটা আতঙ্কের ছাপ ছড়িয়ে পড়লো ওর চোখে মুখে। এই
রঙটাই কেন? এত রঙ থাকা সত্ত্বেও কেন শুধু এটাই? ওর সবচেয়ে পছন্দের রঙ ছিল এটা একসময় কিন্তু এখন সেটা আতঙ্ক ছাড়া আর কিছু আনে না। কে দিতে পারে এই শাড়িটা? বাবি কি পাঠালো তাহলে সরস্বতী পুজোর জন্য? ক্লাস ইলেভেনে ওঠার পর থেকে প্রত্যেক বছর সরস্বতী পুজোয় বাবি একটা করে শাড়ি দেয়। এখন বাড়িতে নেই, কাজের জন্যে
বাইরে, সরস্বতী পুজো কাটিয়ে ফিরবে। কিন্তু বাবিও কি ভুলে গেল? ভেতরে ভেতরে একটা গুমোট কষ্ট যখন দলা পাকিয়ে উঠছে ঠিক তখনই ওর চোখ পড়লো প্যাকেটে সেলোটেপ দিয়ে আটকানো একটা চিরকুটে। ভাঁজটা খুলতেই ওর চেনা হাতের লেখাটা ফুটে উঠলো সামনে
“একটা তোমার মতো চাঁদের জন্য মেয়ে,
 আমি জোছনা সকল হেলায় ভুলে থাকি,
 একটা তোমার মতো মনের জন্য মেয়ে,
আমি হৃদয়টাকে যত্নে তুলে রাখি।”
কী, কেন সব প্রশ্নের উত্তর দেব। দেখা হচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি!”
ঋতু কাগজটাকে মুচড়ে ছুঁড়ে দিল। এটা কী করলি তুই, শুভ? কেন করলি? উপহার দিতে গিয়ে কেন এভাবে কষ্ট দিলি তুই? তুই তো জানিস সবটা! জেনেশুনেও করলি এটা? আচ্ছা, মানুষ যে জিনিসগুলো ভুলতে চায়, যা থেকে সরে থাকতে চায় সেগুলোই কেন বারবার ফিরে ফিরে আসে?
দরজায় নক করে ঢুকলো সৌমিদি।  “বেলা হয়েছে অনেক, এবারে খেয়ে নে মিনু।”
“আমার খিদে নেই, ভালো লাগছে না এখন।” “টেনশনে সকালে তো তেমন কিছু খেয়েই গেলি না, স্রেফ চা বিস্কুট খেয়ে বেরিয়ে
গেলি, পরীক্ষা বলে কিছু বললাম না।” “বলছি তো ভালো লাগছে না! তুমি টেবিলের ওপর খাবারটা ঢাকা রেখে দাও, খেয়ে নেব পরে।”
“আবার পরে? এতক্ষণ খালি পেটে থাকিস না মা, পেটে পিত্তি পড়বে যে!” ঋতুর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না একদম, ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে আসছে কিছু স্মৃতি, বুকের ভেতর চেপে রাখা ক্ষতগুলো টাটকা হয়ে উঠছে আবার। ভেতরের কষ্টটা এবার আস্তে আস্তে বাঁক নিচ্ছে রাগের দিকে, একটা বুনো রাগ যেন ওর শরীর কাঁপিয়ে উঠছে, কষ্টগুলো
লাভার মতো ফুটতে শুরু করেছে। “কী রে, চল? বেশি খেতে হবে না, একটু খেয়ে নিবি আমার সাথে।” এতক্ষণ ধরে বেঁধে রাখা রাগটাই যেন ছিঁড়ে পড়লো এবারে “এরকম মায়ের মতো করো কেন সবসময়? আমি এখন ছোটটি নেই, যথেষ্ট বড় হয়েছি। বললাম তো খেয়ে নেব, তাও কানের সামনে কেন বারবার একই কথা বলে চলেছ? আমার ভালো লাগছে না এখন… ও আচ্ছা, আমি না খেলে তুমিও খেতে পারবে না, তাই না? যাও না, খেয়ে নাও গিয়ে, আমাকে এখন একটু একা থাকতে দাও। আর প্লিজ মায়ের জায়গাটা নিতে এসো না!”
আরো পড়ুন,
 
পাথরের মতো জমে গেল সৌমিদি, মুখ থেকে কথা সরলো না তার। নিঃশব্দে দরজাটা ভেজিয়ে
রেখে বেরিয়ে গেল বাইরে। ঋতুর হিতাহিত কোনো জ্ঞান নেই এখন, মাথা কাজ করছে না
ওর, নাহলে ও ঠিক খেয়াল করতো অজান্তেই সৌমিদির সংবেদনশীল জায়গায় আঘাত দিয়ে
ফেলেছে।
(২)
বসের কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি, পিএ জানিয়েছে স্যারের লাঞ্চ হলেই ডেকে নেবে
আমায়। আমি শুভ, কলিঙ্গ ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে বিটেক করে এই
কোম্পানিতে চাকরি করছি প্রায় মাস চারেক, কলেজ থেকেই ইন্টার্নশিপে ঢুকেছিলাম
তারপর এরাই আমাকে হায়ার করে নেয়। আসলে ছুটি নিয়ে স্যারের সঙ্গে কথা বলার
আছে, যদিও আগেই একবার বলেছিলাম কারণ দুমদাম ছুটি তো নেওয়া যায় না, তার ওপর
আমি নতুন।
বাবা স্কুলের হেডস্যার ছিল, ফলে বিশাল চাপ ছিল তার ওপর, বাড়িতে তাই কোনোদিন
পুজোর কথা বলিনি। আমার হাতেখড়ি হয়েছিল যে বাড়িতে সেখানেই যেতাম অঞ্জলি দিতে।
ঋতুর সাথে আমার আলাপ বাংলা কোচিনে, ক্লাস নাইন। আমার এখনো মনে আছে ও একদিন না
আসায় স্যার ওকে বলেছিল আমার কাছ থেকে খাতা নিয়ে লিখে নিতে কিন্তু আমি ওকে
নিজেই লিখে দিয়েছিলাম। সেই আমাদের বন্ধুত্বের শুরু, তারপর ওর বাড়িতে অঞ্জলি
দিতে যেতাম, কাকিমা সকাল আর দুপুরে না খাইয়ে ছাড়তো না, সে এক দিন ছিল। তারপর
হঠাৎ করেই দুবছর আগে এক দুর্ঘটনায় ঋতুর বাড়ির পুজো বন্ধ হয়ে যায়, মেয়েটা
নিজেকে আলাদা করে নেয় চারপাশ থেকে, বই খাতা ছাড়া বিশেষ সঙ্গী ছিল না ওর। একটা
হাসিখুশি মানুষ চোখের সামনে মরে যাচ্ছিল, আমি বহু বোঝাতাম, খবর নিতাম কিন্তু
মেয়েটা কথা বলাই কমিয়ে দিয়েছিল একদম, বাড়ি থেকে কলেজ আর কলেজ থেকে বাড়ি,
এর বাইরে কোথাও যেত না। তারপর আমার বাবাও রিটায়ার করে গেল গতবছর জানুয়ারিতে,
তখনই ঠিক করে নিয়েছিলাম বাড়িতে পুজো শুরু করব, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে প্রথম
পুজোটা করব আমি আর ঋতুকেও ইনভলভ করাতে হবে, নাহলে ওর ভয় কাটবে না।
আরো পড়ুন,
“হে ইয়াং চ্যাপ, এখানে দাঁড়িয়ে? কিছু বলবে?”
“স্যার, আপনি এখানে?” ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম আমি। “আমিই ভেতরে চলে যেতাম,
আপনি কেন এলেন আবার?”
“আরে, ঠিক আছে। বলো কী দরকার?”
“স্যার, ওই যে ছুটির কথা বলেছিলাম আপনাকে…”
“ও হ্যাঁ, তো বাড়িতে সব ঠিক আছে তো?”
“হ্যাঁ স্যার, সব ঠিক আছে। আসলে বাড়িতে পুজো আছে, তাই আর কি…”
স্যার ভাবলেন কিছুক্ষণ, তারপর হেসে বললেন “তুমি বলেই ছেড়ে দিলাম। যাও, বাড়িতে
কিছুদিন কাটিয়ে এসো, তারপর ফ্রেশ হয়ে লেগে পড়ো এখানে। সামনে ফরেন ডেলিগেটসরা
আসছে, মনে আছে তো?”
“একদম স্যার, থ্যাংকস আ লট।” বোঝাটা নেমে গেল যেন ঘাড় থেকে, নিজের কিউবিকলে
ফিরে আসলাম। আমি জানি আজকে আর কাজে মন বসবে না। স্কুলে টিফিন কিংবা লাস্ট
পিরিয়ডে যেমন ছুটির ঘণ্টার জন্যে অপেক্ষা করতাম, ঠিক সেরকমই, বাড়ির জন্যে মন
ছুটে গেছে আগেই।

দুষ্টু মিষ্টি রোমান্টিক প্রেমের গল্প

(৩)
ছাদে মাদুরের ওপর বসেছিল ঋতু। এমনিতে ওর ছাদে বিশেষ আসা হয়না কিন্তু এই
শীতেরবেলা ফুলগুলোকে দেখলে ওর মনটা ভালো হয়ে যায়, কোথাও যেন মায়ের সঙ্গে
একটা যোগসূত্র তৈরি হয়। আসলে মা খুব ফুলগাছ ভালোবাসতো, সারা ছাদ ভরে থাকতো
রংবেরংয়ের ফুলে কিন্তু জীবন থেকে মা নামক রংটা চলে যাওয়ার পর বাবি সরিয়ে
ফেলতে চেয়েছিল টবগুলো। আসলে কিছু জিনিসের সঙ্গে কিছু মানুষ জড়িয়ে থাকে;
একসময় সেই মানুষটা থাকে না কিন্তু জিনিসগুলোকে দেখলে তার কথা খুব মনে পড়ে।
তারপর থেকে সৌমিদিই যত্ন নেয় এগুলোর। কালকের পর থেকে সে-ও প্রয়োজন ছাড়া কথা
বলছে না বিশেষ, ওকে খেতে দেওয়া থেকে শুরু করে সব কাজই করছে কিন্তু কেমন যেন
দূরে দূরেই রয়েছে। ঋতুর নিজেরই খারাপ লাগছে নিজের ব্যবহারে, কালকে থেকে কতবার
ভেবেছে একবার সরি বলবে কিন্তু কেমন যেন বাধো বাধো ঠেকছে, ও যে আঘাতটা দিয়েছে
সেটা কখনোই সামান্য সরি দিয়ে মাফ হয়না।
মা আসলে চাকরি করতো, ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে, বাড়িতে সামলানোর সময় পেত না, রাতের
সময়টুকু বাদ দিলে সৌমিদিই খেয়াল রাখতো ওর। একটু বড় হয়ে শুনেছিল তার নিজের
একটা সংসার ছিল, পুতুলের মতো একটা মেয়ে ছিল, তার জন্যেই মাতাল বরের অত্যাচার
সত্ত্বেও পড়েছিল ওখানে। কিন্তু কপাল, সেই একরত্তি মেয়েটাকেও কেড়ে নিল
দুদিনের জ্বর, আর তো সংসারে থাকার কোনো মানেই হয়না তাহলে! সেই সময়ে মায়ের
সাথে আলাপ এবং তারপরই এই বাড়িতে এসেছিল সৌমিদি। নয় নয় করে বারো বছর হয়ে
গেছে, এখন বাড়ির লোকই। সত্যি বলতে কি মায়ের অভাব বা অনুপস্থিতি কোনোটাই অনুভব
করতে দেয়না সে। কিন্তু কালকে মাথাটা এত গরম হয়ে গেল যে…ও নিজেকে ঠিক রাখতে
পারেনি একদমই। চোখের সামনে ফিরে এসেছিল সেই দিনের স্মৃতি, বাসন্তী রঙের শাড়িতে
রক্তের দাগ আর ওর চারপাশ শূন্য হয়ে গেছিল নিমেষে।

Otirikto Romantic Golpo

সেদিনও এমনই ধোঁয়া ধোঁয়া ছিল, তার ওড়না সরিয়ে ঠিক করে মুখ বার করতে পারছিল
না অর্কদেব। বাড়িতে সরস্বতী পুজো মিটিয়ে খাওয়াদাওয়া সেরে ও আর শুভ
বেরিয়েছিল একটু। পুরনো বন্ধুদের সাথে হঠাৎই দেখা হয়ে যাওয়ায় সময়ের খেয়াল
ছিল না কারোরই। ফোন বাজতেই ঋতুর টনক নড়ে, প্রায় দেড়টা বাজতে চললো। নিশ্চয়ই
মা ফোন করেছে, বুড়িমাকে খিচুড়ি দিয়ে আসতে দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে। বুড়িমা
সবজি বিক্রি করে, পায়ে দোষ আছে একটু, সামান্য টেনে টেনে চলে। মায়ের বাজার
সারা হয়ে গেলেও মা একবার ঢুঁ মারে ওখানে, ডুমুর রে, কচু রে, বিভিন্ন শাক নিয়ে
সে বসে থাকে এক কোণে। আসলে বুড়িমার কেউ নেই, মা তাই ভালো কিছু বানালে দিয়ে
আসতে বলে ওনাকে।
ঋতু ফোনটা বের করতেই দেখলো বাবা, কানে ধরতেই ফ্যাসফ্যাসে গলাটা ভেসে আসলো ওর
কানে। ও পড়িমরি করে শুভকে স্কুটিটা বার করতে বলে চেপে বসলো পিছনে।
বাড়ি ফিরে ঘরে ঢুকতেই ওর বুকটা ধক করে উঠলো, মা সোফায় শুয়ে আছে সৌমিদির
কোলে, মাথা দিয়ে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে, কিছু দিয়েও যেন চেপে রাখা যাচ্ছে
না। এদিকে রাস্তায় জ্যাম হবে বলে টোটো চলছে না, বাবা অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করেও
পাচ্ছে না। উপায় না দেখে শুভ বলেছিল স্কুটি করে নিয়ে যেতে, যেভাবে রক্ত
বেরিয়ে যাচ্ছে সত্যিই খুব চাপ। অগত্যা রাস্তায় ঝাঁকুনির ভয় সত্ত্বেও
সেইভাবেই ঋতু মাকে বসিয়ে শুভর সাথে গেছিল নার্সিং হোমে। কিছুক্ষণের মধ্যে
পৌঁছে গেছিল বাবিও।
বাবির মুখে শুনেছিল বুড়িমায়ের বাড়ি থেকে ফেরার পর এই গলির মুখে ঢুকতেই
হঠাৎ করে মাথা ঘুরে পড়ে যায় আর পড়ে রনিদের ভাঙা পাঁচিলের পাথরগুলোর ওপর।
বাবি মায়ের পিছনেই ছিল তবে মুহূর্তের মধ্যে ঘটে যাওয়ায় কিছুই করতে পারেনি।
আসলে মা বড্ড চাপা ছিল, শরীর খারাপ থাকলেও মুখ ফুটে কিছু বলতো না যতক্ষণ না
সেটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায় আর সেটাই কাল হলো সেবারে। এখনো মাঝে মাঝে
মনে হয় সবটার জন্যে ও-ই দায়ী, খাবারটা ও দিয়ে আসলে এসব কিছুই হতো না।
 তারপরের টুকু যেন ভেজা কাঁচের ওপার। মায়ের প্রচুর ব্লাড লস হয়ে গেছিল,
বাইরে থেকে রক্ত দেওয়া হয়েছিল, ডাক্তারদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না কিন্তু
সবার সব চেষ্টা, দিনরাত ঋতুর ভগবানের কাছে প্রার্থনা সব বৃথা করে চারদিন পর মা
ছেড়েছিল ইহজগতের মায়া। কেমন যেন ঘোরের মধ্যে ছিল ও সেইসময়, বিশ্বাস করে উঠতে
পারছিল না কী হয়ে গেল ওর সাথে। সেই সময় থেকে ওকে বুকে করে আগলে রেখেছিল
সৌমিদি। রাতের বেলা ওর সাথে শুতো যাতে ও ভয় না পায়, মা না হয়েও মায়ের মতো
হয়ে গেছিল ওর কাছে। ঋতু বোঝে প্রত্যেক মেয়েদের রক্তেই সুপ্ত মা থাকে, সময়
বুঝে সে জেগে ওঠে।

Romantic Premer Golpo In Bengali

“ঋতু, তোর সাথে কে দেখা করতে এসেছে দেখ, আমি ছাদে পাঠিয়ে দিলাম।” নীচ থেকে
সৌমিদির আওয়াজ ভেসে এলো। এই অসময়ে কে এলো আবার? গেট দিয়ে শুভকে বেরিয়ে আসতে
দেখে অবাক হওয়ার সাথে সাথে রাগটাও যেন ফিরে আসলো। মনে পড়ে গেল চিরকুটটার কথা।
ছেলেটা আসবে বলেছিল কিন্তু হঠাৎ এমন করে?
“তুই এসময়ে?”
“হ্যাঁ, কালকেই তো বলেছিলাম দুপুরে আসবো, তুই মেসেজটা পড়িসনি বোধহয়।”
“হ্যাঁ, নেট অফ।…তুই ছুটি পেলি কী করে? এই তো সেদিন চাকরি পেলি!”
“সে আমি ম্যানেজ করে এসেছি, বাদ দে সেসব। যেটা বলার, কাল বাড়িতে পুজো, ডট
সাড়ে আটটায় যেন দেখতে পাই।”
“তোর বাড়িতে পুজো কবে থেকে শুরু হলো? আর তুই জানিস না, আমি কোনো পুজো বাড়িতে
যাই না এখন?”
“তো কী করবি? দরজা বন্ধ করে বসে থাকবি? একা একা কষ্ট পেয়ে দোষারোপ করবি
নিজেকে?…আমার বহুদিনের শখ ছিল বাড়িতে পুজো হবে, সেই শখটা আমি পূরণ করতে
পেরেছি আর তার জন্যেই এত দূর থেকে ছুটে আসা। এতবছর আমরা অঞ্জলি দিতাম একসাথে,
তোর বাড়িতে। আর এবারে যখন আমার বাড়িতে প্রথমবার পুজো, তুই না আসলে চলে, বল?”
“আমি কী করব না করব, সেটা তোর না ভাবলেও চলবে। সবটা জানার পরও যদি এমন বলিস,
আমার আর সত্যিই কিছু বলার নেই!”
“ঋ! আমি সবটা জানি, সবটা বুঝি। কিন্তু অতীতটা তুই যত ড্র্যাগ করবি, ততই তো কষ্ট
পাবি। এটা কেন বুঝতে চাইছিস না?”
“আমি তো যেচে কষ্ট পেতে চাইনি, আমি তো সবসময় ভুলে থাকতে চাই। কিন্তু কেন
বারবার মনে করিয়ে দিস তোরা? শাড়ি কে পাঠাতে বলেছিল তোকে?”
“কারণ আমি তোকে প্রমিস করেছিলাম ফার্স্ট স্যালারির টাকায় তোকে শাড়ি কিনে দেব
আর এর থেকে বড় সুযোগ আমি বোধহয় পেতাম না।”
“তা বলে ওই রঙটাই? তুই তো জানিস বল আমি কী পরিমাণ ঘেন্না করি রঙটাকে।”
“সরি রে! ভেবেছিলাম সেটা কিন্তু তুই যে এতটা কষ্ট পাবি বুঝতে পারিনি…আচ্ছা,
আমি যদি খুব ভুল না হই ক্লাস ইলেভেন থেকে প্রত্যেকটা সরস্বতী পুজোয় তুই হলুদ
রঙের শাড়ি পরেছিস। কাকিমাও বলতো তোকে হলুদে দারুণ মানায়…”
“That was past.”
“আমিও সেটাই বলতে চাইছি, ওটা পাস্ট, যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। আমি জানি যে
ক্ষতিটা তোর হয়ে গেছে সেটা কখনো পূরণ হওয়া সম্ভব নয় কিন্তু তুই যদি এরকম করে
থাকিস, সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিস, ভালো লাগে বল? কাকু কিংবা সৌমিদি তোকে
কিছু বলে না ভয়ে but it’s not a life, এমনভাবে তো চলতে পারে না।”
“কী বল তো শুভ, হারিয়েছি তো আমি, তাই আমার জায়গাটা তুই কখনো বুঝতে পারবি না।
মুখে বলা খুব সোজা রে!…কালকে তো বাড়িতে একটা শুভ কাজ করতে চলেছিস তাই আমি
অমঙ্গলের ছায়া হয়ে যেতে চাই না!”
“Are you mad? কি যাতা বলছিস তুই?
“হ্যাঁ, এটাই আমার ফাইনাল কথা, তুই যে আমায় নিমন্ত্রণ করতে এলি তাতেই আমি খুশি
রে। এবারে তুই আসতে পারিস…”

বেস্ট রোমান্টিক গল্প

এরপরে আর কিছু বলার থাকতে পারে না, শুভ উঠে চলে গেল। অলক্ষ্যে এদের কথাবার্তা
শুনছিল সৌমিদি, ভেবেছিল শুভ অন্তত মেয়েটাকে বুঝিয়ে রাজি করাতে পারবে কিন্তু
সে গুড়ে বালি। কালকে ঋতুর ব্যবহারে ওর যতটা না রাগ হয়েছে তার থেকে বেশি
পেয়েছে কষ্ট, ছোটবেলা থেকে একপ্রকার মানুষই তো করলো মেয়েটাকে, নিজের রক্তের
না হলেও আত্মিক টান তো রয়েছেই। ও মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল আরেকবার বোঝানোর
চেষ্টা করবে, মেয়েটা যদি দুটো কড়া কথা বলে হজম করে নেবে; মায়ের জায়গাটা ও
নিতে চায়না কখনোই কিন্তু  বন্ধু হতে দোষ কোথায়?
(৪)
পুজোর জন্যে দুধ নিয়ে এসে বসে আছি, এদিকে মা ক্রমাগত ঠাকুর মশাইকে ফোন করতে
বলছে। সাড়ে আটটায় আসার কথা তার, এদিকে ঘড়ির কাঁটা প্রায় সাড়ে নটা ছুঁই
ছুঁই তার পাত্তা নেই। কিন্তু সেটা নিয়ে আমার চিন্তা নেই, আমার চিন্তা হলো ঋতু
আসবে তো? কালকে যেভাবে রেগে গেছিল, আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম। শাড়িটা দেখে বিশেষত
শাড়ির রং দেখে মেয়েটা যে এতটা রিয়্যাক্ট করবে, বুঝতে পারিনি। কিন্তু এত করে
যে বোঝালাম, ভুলের জন্যে সরি বললাম, তাতেও মেয়েটার মন গললো না? আমি যে এত কিছু
প্ল্যান করে এত দূর থেকে ছুটি নিয়ে আসলাম, সেটা কি বৃথা যাবে তাহলে? আমি কি
ভুল করে বড্ড বেশি আঘাত দিয়ে ফেলেছি? ফোন করলাম ওর ফোনে, এখনো সুইচড অফ! মা
আমার মুখ চোখ দেখে যেন কিছু একটা আন্দাজ করছিল অনেকক্ষণ, কাছে এসে বললো, “অত
বেশি ভাবিস না রিক, মেয়েটার আসার হলে এমনিই আসবে। আসলে এমন একটা শক পেয়েছে
সেটা কাটিয়ে উঠতে সময় তো লাগেই, তাই না?” আমি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে
রইলাম। মা মাথায় হাত দিয়ে বললো, “তবে এই কথাটা মনে রাখিস কেউ যখন কিছু একটা
মন থেকে খুব করে চায়, ঠাকুর তাকে নিরাশ করে না।”
আরো পড়ুন,
 
ঠাকুর মশাই চলে এলো কিছুক্ষণের মধ্যেই, এসেই কী তাড়া! “এটা কই”, “হাতের কাছে
নেই কেন”, “বড্ড দেরি করিয়ে দেন আপনারা!” ব্যতিব্যস্ত করে তুললো পিসিকে আর
মাকে। আস্তে আস্তে পাশের বাড়ির ভাই, বোনেরা চলে এলো, আমি তখনো ছাদে দাঁড়িয়ে,
সত্যিই কি তুই আসবি না ঋ? দীর্ঘশ্বাস চেপে নিচে নামলাম, ক্যামেরাটা নিয়ে আসি
যাই। ঘর থেকে ক্যামেরাটা নিয়ে বেরোব, আমি স্থির হয়ে গেলাম আচমকা, দুটো
হার্টবিট মিস হলো আমার। আমার সামনে বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে ঋতু,
কপালে একটা লাল রঙের ছোট্ট টিপ, খানিক হাঁপাচ্ছে, নাকের পাটা আর বামগালে তিলের
জায়গাটা লাল, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। চোখে মুখে একটা অপরাধবোধ নিয়ে
বললো, “বড্ড দেরি হয়ে গেল রে। সরি!… পুজো হয়ে গেছে না?… মিষ্টিটা?” রাগ
করতে গিয়েও হেসে ফেললাম আমি, “না রে, ঠাকুর মশাই তোর জন্যে ভিডিও কলে
পুষ্পাঞ্জলির কথা বলছিলেন।…মিষ্টিটা আমায় দে, সকাল থেকে এখনো কিছু খাইনি,
পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে।”
“মানে?”
“ওপরে চল মা তাড়াতাড়ি, মিষ্টিটা মাকে দিয়ে দিবি, ঠাকুর মশাই নির্ঘাত আমার
ষষ্ঠীপুজো করছে এতক্ষণে… ওঃ, দাঁড়া একমিনিট।”
পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে কপালের ঘামটা মুছে দিলাম, চোখের সামনে থেকে চুলটা সরিয়ে
বললাম চ। ঋতু বড় বড় চোখ করে তাকালো আমার দিকে, বললো কিছু একটা, আমি শুনতে
পেলাম না; ওপর থেকে মায়ের চিৎকার “কী রে রিক, কোথায় আটকে গেলি বল তো? এই
ছেলেটাকে নিয়ে আমি আর পারি না!”
ওপরে আমি আর ও একসাথে উঠতেই, মা হালকা করে চোখ টিপলো আমায়। ঋতু গিয়ে বসলো
মায়ের পাশে, মা কানে কানে কিছু একটা বললো ঋতুকে, আর আমি প্রথম ঋতুকে হাসতে
দেখলাম এতদিন পর, শুষ্ক শীতের শেষে বসন্ত বোধহয় চলেই এলো। আমার দিকে তাকিয়ে
অপলকভাবে হাসছে মেয়েটা, ওর মুখে সূর্যের আলোটা পড়ে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে ওকে।
আমি ভুলে গেলাম আমার হাতে ক্যামেরা আছে, আমি ভুলে গেলাম এই মুহূর্তটা একবার মিস
হয়ে গেলে আবার কবে দেখতে পাব, আমি স্থান কাল পাত্র ভুলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো
চেয়ে রইলাম ওর দিকে। আসলে ক্যামেরা দিয়ে মুহূর্ত বন্দী করা যায়, অনেক বছর পর
ধুলো মাখা স্মৃতিকে সেই ছবিতে নতুন করে আবিষ্কার করা যায়, মুহূর্তকে অমরত্ব
দেওয়া যায় কিন্তু লাইভ ম্যাচ দেখা আর হাইলাইটস, তফাৎ তো আছে বস!
***
গঙ্গার পারে জমিদারবাড়ির দালানে বসেছিলাম আমরা। এই জায়গাটা একটু নিরিবিলি,
ভিড়ের ক্যাঁচরম্যাচর থেকে অনেকটা শান্তি। এখানে কাউকে আসলে ঢুকতে দেয়না,
নেহাত রবিখুড়োকে আমি চিনি আর খুড়োর কাছেই আমি পড়তে আসতাম, তাই আমার জন্যে
ছাড়। প্রায় বছর তিনেক পর আসলাম, প্রথমে আমাকে চিনতেই পারেনি, তারপর নমস্কার
করে নাম বলতেই খুড়ো জড়িয়ে ধরলো আমায়, গায়ের কর্পূর মেশানো গন্ধটা সেই একই
রয়ে গেছে এখনো।
“কী ব্যাপার বল তো, তোর পছন্দের জায়গায় নিয়ে আসলাম, এখনো চুপ করে থাকবি?”
“না, মানে…”
“কালকের জন্যে সরি বলবি তো? ওটা আমি ধরিইনি। তুই যে আজ এসেছিস আমি সত্যিই খুশি,
কোথাও মনে হয়েছিল তুই অন্তত আমার আবদার ফেলতে পারবি না।”
“না রে, রাগটাকে কন্ট্রোল করতে পারছি না জানিস একদম। সৌমিদিকেও সেদিন ওরকম
বললাম, যদিও কাল সরি বলেছি কিন্তু সরি বললেই সাত খুন মাফ?”
“দেখ, রাগটাকে কন্ট্রোল তো করতেই হবে। কিন্তু এই বোঁচা নাকে যদি এত রাগ করিস,
গ্ল্যামারটা নষ্ট হবে না?”
“উফ, তুই না…ভুলে যাস না আমি কিন্তু এখনো তোর ওপর একটু হলেও রেগে আছি।”
“সে একটু রেগে থাকা ভালো, রাগ মেটাতে ভালো লাগে আমার।…আপাতত চুপটি করে বস
দেখি, রাগলেও তোকে মিষ্টি লাগে বেশ, ছবিগুলো সুন্দর আসবে।”
আবারও ওর গালগুলো লাল হয়ে গেল, কানের লতিতে আবিরের ছোঁয়া। মা ঠিকই বলেছিল, মন
থেকে কিছু চাইলে ঠাকুর সবসময় নিরাশ করে না।

Bangla Romantic Premer Golpo PDF

(৫)
ব্যাগটা আমি গুছিয়ে নিয়েছি কাল রাতেই, এখন একবার দেখে নিচ্ছিলাম সব ঠিক আছে
কিনা, যদিও নেওয়ার মতো বিশেষ কিছু নেই, শুধু ওই ঢাউস ক্যামেরা আর তাতে বন্দী
কিছু সময় ছাড়া। যেভাবে হাতের আঁজলা দিয়ে জল চুঁইয়ে পড়ে, সেরকমই কোন
ফাঁকতালে বেরিয়ে যায় সময়, বেরিয়ে যায় মুহূর্ত। এই না বুধবার সকালে আসলাম,
তারপর হুড়মুড় করে কোথা দিয়ে কেটে গেল তিন তিনটে দিন। আবার ফিরতে হবে ওই
অফিসের ঘেরাটোপে, চোখ ব্যথা হয়ে যাওয়া কম্পিউটার স্ক্রিনে।
মাকে বলে দিয়েছি খাবার দেওয়ার দরকার নেই, ও ট্রেনেই নিয়ে নেব, বেকার বেকার
ব্যাগ ভারী করে কি লাভ! মা একটু গাইগুই করছিল বটে কিন্তু আমি ম্যানেজ করে
নিয়েছি। তবে দুপুরে মাকে পছন্দের আলুপোস্ত আর শোল মাছ করতে বলেছিলাম, আবার কবে
যে মায়ের হাতের রান্না খাবো তার ঠিক নেই।
খেয়ে নিয়ে একটু পায়চারি করছিলাম, অনেকটা খাওয়া হয়ে গেছে। ওখানে বন্ধুরা
মেসে থাকি, কেউ খাওয়া নিয়ে বলার নেই, জোর করার নেই কিন্তু মা কি আর ছাড়ে?
“এই তো চেহারার ছিরি, আমি দেখি না তাই যা ইচ্ছে তাই করিস, পুরো অনিয়মের
বাসা।…যা দিয়েছি সব শেষ করে উঠবি!” মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসছিলাম আমি। ওখানে
থাকাকালীন এই শাসনগুলো বড্ড মিস করি। একটা কথা মনে হয় ছোটবেলায় সবাই ভাবি বড়
হয়ে গেলে কেউ বকবে না, স্বাধীন, নিজের মর্জিমতো চলা যায়; কিন্তু মানুষ মনে
মনে চায় কেউ একজন জোর খাটাক, আগলে রাখুক, থাকুক কেউ মাথার ওপরে।
বিছানায় শুয়ে পুজোর দিনের ছবিগুলো দেখছিলাম মোবাইলে। সব ওখানে গিয়ে ল্যাপিতে
নিয়ে ড্রাইভে সেভ করব। একবার পুরনো অ্যালবামগুলো ঘাঁটতেই চোখ পড়লো সাদা কালো
একটা ছবির দিকে, সাতবছর আগে তোলা সরস্বতী পুজোর ছবি, আমাদের দুজনের তোলা প্রথম
ছবি। শেষ ছবিটা দুবছর আগের, সেইদিনের যেদিন বিপর্যয় নেমে এসেছিল ঋতুর ওপরে।
আমার কেন জানি না মনে হয় মানুষ যেদিন সবচেয়ে বেশি আনন্দ করে, খুশি থাকে ঠিক
সেইদিনের ওঁত পেতে থাকে বিপদ, তারপর থাবা মারে, রঙিন ভাবকে দখল করে ধূসরতা।
সেইসময়েই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম রঙকে ফিরিয়ে আনবো, ঋতুকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবো
স্বাভাবিক জীবনে। কতটা পেরেছি জানি না কিন্তু চেষ্টাটুকু করছি। ঋতু বলেছে আসবে
একবার দেখা করতে বিকেলের দিকে।
কখন যেন চোখ জড়িয়ে এসেছিল ঘুমে। একটা আলগা অথচ সতর্ক ডাকে চটকা ভাঙ্গলো, চোখ
খুললাম আমি।
“ডিস্টার্ব করলাম না? একটু শুয়েছিলিস…”
“না রে, বোস।” একটু উঠে সরে গিয়ে বালিশে হেলান দিলাম আমি। ওর মুখচোখ এত শুকনো
লাগছে কেন?
“কিছু বলবি?”
“না, মানে…কত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছিস বল তো! ঠিক করে কথাও হলো না তোর
সাথে…”
“তাও তো ছুটিটা পেয়েছিলাম বলে।”
“আবার কবে ফিরবি?”
“জানি না রে। একটু থিতু হই, তারপর দেখছি, এখানে চলে আসতে পারি কি না…”
“আন্টির কাছে শুনলাম খাবার নিসনি, ব্যাগ নাকি ভারী হয়ে যাবে…”
“আরে হ্যাঁ, কিনে নেব কিছু একটা।”
“ওহ! আমি না আসলে তোর জন্যে একটু চাউমিন করে এনেছিলাম, সঙ্গে একটু চিলি চিকেন।
আন্টিকে ওটাই বলতে গেছিলাম যে তোকে কিছু দেওয়ার দরকার নেই, আমি লাস্ট মিনিট
মাইক্রোওভেনে গরম করে ঢুকিয়ে দেব।”
“কেন শুধুমুধু কষ্ট করতে গেলি বল তো?”
ঋতু কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। তারপর মাথা নিচু করে বললো,
“আর করব না…”
“আরে! আবার রাগ করে। বলতে চাইলাম, সে তো তুই এখানেও খাওয়াতে পারতিস।”
ঋতু চুপ করে রইলো। ধুর! কি যে করি আমি? মেয়েটা আমার ফেভারিট জিনিস বানিয়ে
এনেছে, কোথায় খুশি হয়ে থ্যাংকস বলব, দিলাম মুডটাকে বিগড়ে।
“সরি রে! এরকম চুপ থাকিস না প্লিজ, চলে যাব আজকে, তোর এরকম মুখ দেখে যাব?”

Bengali Romantic Love Story

তারপর গল্পে গল্পে কেটে গেল বাকি সময়টুকু, এবার রেডি হতে হবে, ঋতুও উঠলো খাবার
গরম করতে। বাবা বলছিল হাওড়া অবধি যাবে কিন্তু বারণ করে দিয়েছি, একা ফিরবে
আবার, শীতের রাত, কোথায় ঠাণ্ডা লেগে যাবে। দুজনকে নমস্কার করে বাবা মায়ের ঘর
থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকছি, দেখি ঋতু ব্যাগের সামনে উবু হয়ে বসে কী করছে।
আমার পায়ের আওয়াজে চমকে গেল ও, তারপর মুখটা আবার স্বাভাবিক করে বললো, “সামনের
চেনে রাখলাম খাবারটা। সময়মতো খেয়ে নিস।”
বেরোনোর সময় দেখি, ঋতু স্কুটি নিয়েই এসেছে। বাবা বলছিল অন্তত স্টেশন অবধি
ছাড়তে যাবে কিন্তু মায়ের ইশারায় চুপ করে গেল। সত্যি মা, তুমি না…।
স্কুটিটা বের করলো ঋতু, তারপর উঠে বসে পড়লো। অবাক হলাম আমি, সাধারণত দুজন
থাকলে আমিই চালাই। ঋতু আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো, “আজকে আমি চালাবো, চাপ
নেই, কাউকে ঠুকে দেব না!”
রতনকাকুর রোলের দোকানের সামনে গাড়িটাকে স্ট্যান্ড করে দুজনে আসলাম
প্ল্যাটফর্মে। ঋতু আমার দিকে তাকাচ্ছে না আর সেইভাবে। আমি বুঝতে পারছি অনেক
কষ্টে চেপে রেখেছে ও কান্নাটা। কিন্তু যাওয়ার সময় কাঁদতে নেই বলেই ও নিজেকে
সামলাচ্ছে। আমারও মনটা কেমন করছে একটা। খালি মনে হচ্ছে ঋতু যেন কিছু একটা বলতে
চাইছে কিন্তু বলতে পারছে না।
“ঋ, শোন…”
“হ্যাঁ রে, বল।”
“তাকা আমার দিকে…”
ঋতু ওর ছলছলে চোখদুটো স্থির করলো আমার চোখে। হাতটা ধরে বললাম, “আমরা সবার ওপরে
নিজের রাগ, অভিমান দেখাইনা। খুব কম মানুষকে নিজের সবটা বলি। আমি তোর সেই ছাদের
ঘরটা ছিলাম, আছি আর থাকবো। দূরে আছি মানে এই নয় যে তোর কাছে নেই, সশরীরে না
থাকলেও তোর সঙ্গেই আছি সবসময়।”
প্ল্যাটফর্ম কাঁপিয়ে ট্রেন এলো আমার, উঠে পড়লাম আমি। তারপর যত্তক্ষণ দেখা
যায় তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। মাঘ মাসের হালকা শীত, কুয়াশার চাদর আমাদের
দৃষ্টিবন্ধনে বাধা সৃষ্টি করলেও আমি বলতে পারি মেয়েটা আরো কিছুক্ষণ তাকিয়ে
থাকবে এই দিকে, তাকিয়ে থাকবে আমার চলে যাওয়ার দিকে; আজ থেকে আমার বাড়ি ফেরার
অপেক্ষা করার জন্যে আরো একজন মানুষ বাড়লো।
***
হাওড়া থেকে ট্রেনে উঠে মনটা ভালো হয়ে গেছিল, লোয়ার বার্থ, সিটটা পড়েছে একদম
জানলার পাশে, আমার সবচেয়ে পছন্দের জায়গা। কাঁচের শাটার দিয়ে রেখেছি আর এখন
সেখান দিয়ে হু হু করে চলে যাওয়া স্টেশনের নামগুলো পড়ার চেষ্টা করছি। কানে
ব্লুটুথ স্পিকার গোঁজা, অনুপম রায়। হঠাৎ ফোনের রিংটোনে সম্বিত ফিরল। ঠিক ধরেছি
মায়ের, খেয়েছি কিনা জিজ্ঞেস করবে। সামান্য কিছু কথা বলে কেটে দিলাম ফোনটা।
হাত ধুয়ে এসে ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে টিফিনবক্সটা বের করলাম। মেয়েটা বেশ
সুন্দরভাবে প্যাক করেই দিয়েছে যাতে খাবার কোনোভাবে পড়ে না যায় ব্যাগে।
কিন্তু সাইডে আরেকটা প্লাস্টিক হাতে ঠেকলো না? ওটা কীসের? আমি তো ওই চেনে কিছু
রাখিনি। প্লাস্টিকটা বের করে খুলতেই ভেতর থেকে একটা সোয়েটার বেরিয়ে এলো,
মেরুন রঙের, তাতে হাতের কাজ। গলার কাছে একটা সাদা কালো ছবি, ছবিটা আমার বড্ড
চেনা, আজকে দুপুরেই তো দেখছিলাম ফোনে কিন্তু এটা এখানে? ছবিটা ওল্টাতেই পিছনে
কয়েকটা লাইন চোখে পড়লো আমার:
“আমাদের সবার বুকের ভেতরই একান্ত নিজের একটা জগৎ থাকে, নিজের একটা মানুষ থাকে।
সেই মানুষটার কাছে আমরা শিশু হয়ে যেতে চাই। আমরা চাই সেই মানুষটা আমার
খামখেয়ালি বুঝুক। আমার রাগ, অভিমান, ভালোবাসা, দুঃখ, আনন্দ সব বুঝুক। আমি না
বলতেই বুঝুক।”
অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম তোমাকে নিজে হাতে বানিয়ে কিছু একটা দেব কিন্তু কী দেব
এটাই ঠিক করে উঠতে পারছিলাম না। তোমার তো প্রচুর ঠান্ডার ধাত এদিকে সোয়েটার
পরতে অনীহা, এবারে হিরোগিরি ছেড়ে এই সোয়েটারটা পরো, তোমাকে মানাবে ভালো। আর
এই যে, নিজের খেয়াল রেখো, আমি কিন্তু দিনগোনা শুরু করলাম, দেখি কতটা অপেক্ষা
করাতে পারো তুমি আমাকে!” একটা আলগা হাসি খেলে গেল আমার মুখে। এই কারণে মেয়েটা
নিজেই ঢুকিয়েছিল টিফিনবক্সটা, আমাকে হাত দিতে দেয়নি আর। এমন জায়গায় রেখেছে
যেখানে আমি হাত দেব না সহসা।
সোয়েটারের ওপর হাত বোলালাম আমি, ঠিক কত রাতের ঘুম উড়েছে? ঠিক কতটা আবেগ মিশে
আছে? ঠিক কতটা যত্ন, কতটা ভালোবাসা বোনা রয়েছে এটায়? মোটা জামাটার ওপর দিয়ে
গলিয়ে নিলাম। একটা ওম যেন আঁকড়ে ধরলো আমাকে, কয়েকশো কিলোমিটার দূর থেকে কোনো
একজন প্রিয় মানুষ তার কাছের মানুষকে টেনে নিল বুকে, জড়িয়ে ধরলো পরম আবেশে।
একটা সেলফি তুলে টাইপ করে পাঠিয়ে দিলাম “I carry your heart, I carry it in my
heart.”  ওপাশে সত্যিই অপেক্ষা করছিল ঋ, একটা মেসেজের, তার কাঙ্খিত
বার্তার। সঙ্গে সঙ্গে মেসেজ সিন হয়ে গেল, টাইপিং…টাইপিং…টাইপিং…কী হলো?
এতক্ষণ ধরে কী লিখছে মেয়েটা? কী বলতে চাইছে ও? তুই থেকে তুমি র অপেক্ষাটা তো
শেষ হলো, আর কী চমক তাহলে অপেক্ষা করছে আমার জন্যে?
অপেক্ষা অদ্ভুত একটা জিনিস। ভালো কিছু হওয়ার আগে আমাদের ধৈর্য্য ধরতে শেখায়,
পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখায়, বিশ্বাস রাখতে শেখায় এই ভেবে যে
অপেক্ষা কখনো বিফলে যায় না কিন্তু তা না হলে? আমরা এই ‘না’ টাই তো ভাবতে চাই
না। এত নেগেটিভিটির মাঝেও আমরা তাই আশা করে থাকি, তাই তো আমরা অপেক্ষা করতে
ভালোবাসি।
Share This Article
Leave a comment

Adblock Detected!

Our website is made possible by displaying online advertisements to our visitors. Please consider supporting us by whitelisting our website.