Thriller Story In Bengali – বিষাক্ত রহস্য – Bengali Suspense

Bongconnection Original Published
25 Min Read

Thriller Story In Bengali – বিষাক্ত রহস্য – Bengali Suspense

 

Thriller Story In Bengali - বিষাক্ত রহস্য - Bengali Suspense
Loading...


Bengali Thriller Story

বিষাক্ত রহস্য
        – সামিম মাটিন 
খটকা সবার লাগতে শুরু করলো যখন ছোটকাও সাপের কামড়ে মারা গেল গতকাল l দুমাস আগে
শ্যাম অর্থাত্ ছোটকার ড্রাইভারও মারা যায় সাপের কামড়ে ।  তখন পাড়া
প্রতিবেশী এটাকে দুর্ঘটনাই আখ্যা দিয়েছিল । কিন্তু ছোটকা মারা যাওয়ার পর সবাই
এতে রহস্যের গন্ধ খুঁজতে শুরু করলো । 
ছোটকাকা একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করে l মাইনে বেশ মোটা রকমের পায় ।
আদ্যপান্ত পড়াশুনোয় ভালো থাকায় পাড়ায় একটা গুডবয় ইমেজ আছে ছোটকার । তার উপরে
পড়াশুনো শেষ হতেই ভালো চাকরি পেয়ে যাওয়াটা তার টুপিতে বাড়তি পালকের কাজ করেছে ।
এই যে ভালো পড়াশুনো,  ভালো চাকরি করা,  গুডবয় ইমেজ এগুলো কিন্তু
ছোটকার মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন অহংকার নিয়ে এসেছিল । ছোটকা জেনে গিয়েছিল সে
পরিবারে, আত্মীয় স্বজনের মাঝে, সমাজে, পাড়ায় ধীরে ধীরে একটা কেউকেটার আসন করে
নিতে চলেছে । 
আমাদের এই বরানগরের সাউথ লেনের বাড়িতে আমরা পাঁচজন থাকি । আমি মা বাবা ছোটকাকা
আর ছোটকাকিমা । ছোটকাকার সদ্য বিয়ে হয়েছে l এই প্রায় সাত আট মাস হলো l কাকিমার
বাড়ি ঝাড়খন্ডের দলভূমগড়ে । দলভূমগড় হলো ঘাটশিলার আগের স্টেশন । প্রায় বারো তেরো
কিলোমিটার আগে । 

Suspense Story In Bengali

আমার বাবা স্থানীয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুলের অংকের শিক্ষক । ভালো
শিক্ষক হিসেবে বাবার খুব সুনাম আছে । স্থানীয় এবং দূরদূরান্তের লোকজন বাবাকে
মান্য করে একজন আদর্শ এবং জ্ঞানী শিক্ষক হিসেবে । বাবার হাত ধরে অনেক ছাত্র
আইআইটি, শিবপুর, যাদবপুর এনআইটিতে চান্স পেয়েছে । আমি ফিজিক্স অনার্স নিয়ে
প্রেসিডেন্সিতে পড়ি । আমার প্রেসিডেন্সি কিংবা ছোটকার আইআইটির পেছনে সম্পূর্ণ
অবদান কিন্তু বাবার । যদিও ছোটকার এই আমেরিকান কোম্পানিতে জয়েন করার পর থেকে তা
মানতে রাজি নয় । বলে সম্পূর্ণ কৃতিত্ব তার নিজেরই l বাবা অবশ্য তাতেও খুশি l
ছোট থেকেই ছোটকাকে ছেলের মতো মানুষ করেছেন কিনা l ঠাকুর্দা যখন মারা যান তখন
বাবা সবে স্কুলে শিক্ষকতা করতে ঢুকেছে আর ছোটকা ক্লাস ফোরে পড়ে । ফলে ছোটকার
পুরো দায়িত্ব বাবাকেই কাঁধে নিতে হয় ।


ছোট কাকিমা ছন্দা ভারী মিশুকে আর অত্যন্ত মিষ্টি স্বভাবের । এই আট মাসে আমাদের
বাড়ির সবাইকে এমন ভাবে আপন করে নিয়েছে যে মাঝে মাঝে মনে হয় ও বুঝি এ বাড়িরই
মেয়ে এ বাড়িতেই জন্মেছে । সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক আমার সাথে । আমার বন্ধু হয়ে গেছে
। আর তাছাড়া বয়সেও তো আমারই সমান । ছোটও হতে পারে কিন্তু বড় কখনোই নয় । আমার
কলেজ ছুটির দিনে সারাদিন আমাদের আড্ডা মেরেই কেটে যায় । 
আরো পড়ুন,
আমার একটা ডায়রি আছে যাতে আমি আমার সব কথা লিখে রাখি । আমার রাগ, দুঃখ, 
ভালোবাসা,  ভালোলাগা, খারাপ লাগা,  গোপন, অগোপন সব কিছু এতে উগড়ে দিই
। এই ডায়রি আমার সবচাইতে প্রিয় বন্ধু, প্রিয় সাথী । ছন্দা কাকিমাই দিয়েছিল এই
ডায়রি আমাকে । আমার সাথে আমার ছোটোবেলার বন্ধু স্বাতীর বন্ধুত্ব থেকে বিশেষ
বন্ধু হওয়ার সমস্ত গল্পই এতে লিপিবদ্ধ আছে । অবসর সময়ে এই ডায়রি পড়ে আমি
স্মৃতির অতলে হারিয়ে যাই যা কিনা অদ্ভুত এক পরিতৃপ্তি আমার মনে এনে দেয় । 
আমার এক ছোট বোন ছিল মিতা । ভালো নাম ছিল অন্বেষা । বছর চারেক আগে আমরা একবার
যখন মামার বাড়ি উত্তরবঙ্গে ধূপগুড়িতে ঘুরতে যাই তখন মাঠে খেলতে গিয়ে সাপের
কামড়ে মিতা মারা যায় । তাড়াতড়ি করে স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও
অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন না থাকায় মিতাকে বাঁচানো যায়নি । বাবা খুব ভেঙে পড়লেও
সামলে নিয়েছিল । মা পারেনি । সেই যে মানসিক ভারসাম্য হারালো  আজও পুরোপুরি
সুস্থ হয়নি । 
আমি ছোট কাকিমার মধ্যে মিতাকে দেখতে পাই । মনে হয় সেই হাসি সেই গলার স্বর সেই
ভ্রু কুঁচকে কথা বলার ধরন । হুবহু এবং অবিকল । সেই জন্যই ছন্দা কাকিমাকে আমার
আরো বেশি ভালো লাগে । 

কিন্তু ভালো লাগে না ছোটকার । ছন্দা কাকিমার সাথে আমার এত ঘনিষ্টতা তার
একেবারেই পছন্দ নয় । প্রায় প্রতি রাতেই ছোটকা অফিস থেকে ফিরে আসার পর দুজনের
মধ্যে খিটিমিটি লেগেই থাকে । আমি পাশের ঘরেই থাকি বলে ওদের বাকবিতণ্ডা অস্পষ্ট
শুনতে পাই । কখনো কখনো ছোটকার চাপা গর্জন আবার কখনো কাকিমার ফুঁপিয়ে কান্নার
আওয়াজ নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে । যার ফলে আমি আজকাল কাকিমার সাথে বেশি কথা
বলি না । একটু এড়িয়েই চলি । আমি বুঝি এতে কাকিমা আরো বেশি মনমরা হয়ে থাকেন ।
আমারও ভালো লাগে না । এবাড়িতে আমিও একজন কথা বলার লোক পেয়েছিলাম । পেয়েছিলাম
একটা ভালো বন্ধু । 

ক্রাইম থ্রিলার গল্প

কিন্তু বিধি বাম থাকায় আমাদের বন্ধুত্ব দীর্ঘস্থায়ী হলো না । ছোটকার সাথে সাত
দিনের জন্য ধলভুমগড়ে বাপের বাড়ি গিয়ে কোথায় ফুলডুঙ্গরি পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে সাপের
কামড়ে মৃত্যু হলো । ভীষন বিষাক্ত সাপ ছিল । হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় পর্যন্তই
পাওয়া যায়নি । ছোটকা নিজের গাড়ি নিজের ড্রাইভার নিয়ে গিয়েছিল । স্থানীয় ডাক্তার
ছোটকাকে বলেছিলেন যখন সঙ্গে গাড়ি ছিল তখন তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যান নি কেন ?
তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে গেলে হয়তো বেঁচে যেত । কারণ ওই অঞ্চলে সাপের ভীষন
উপদ্রবের কারণে হাসপাতালে নিয়মিতভাবে অ্যান্টিভেনমের জোগান থাকে । শেষ
নিঃশ্বাসের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত অ্যান্টিভেনোম ইন্জেকশনে কাজ হয় । ছোটকাকারই
বা কি করার ছিল ? ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গিয়েছিল। ফলে সিদ্ধান্ত নিতে পারে
নি কি করবে আর কি করবে না । আর ড্রাইভার শ্যাম,  সে বেচারা তো আজ্ঞাবহ ।
তার এ ব্যাপারে কোন জ্ঞানগম্যি নেই । থাকলেই বা কে শুনছে ?
আরো পড়ুন,
সেবার ছোটকা খুব কেঁদেছিল । দুজনের মধ্যে যতই ঝগড়া হোক,  ভালো তো বাসতো
বৌকে । সারাদিন ঘরের মধ্যে দরজা বন্ধ করে থাকতো । কারো সাথে কোন কথা বলতো না ।
দরজাও খুব একটা খুলতো না । টানা দুসপ্তাহ অফিস যায়নি । । শুধু ওই শ্যাম নামের
ড্রাইভার ছেলেটি মাঝে মধ্যে ছোটকাকে স্বান্তনা দিতে এলে কখনো সখনো দরজা খুলে
দিত কখনো আবার দিত না । কিছুদিন পর ছোটকা যখন অফিসে যেতে শুরু করলো রোজ অফিস
থেকে ফিরে এসে কাকিমার বাঁধানো ছবির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতো । মাকে ব্যাপারটা
জানানো হয়নি । কারণ এই ধাক্কা মা যদি সামলাতে না পারে ! মা মাঝে মাঝে জিজ্ঞাসা
করতো, “হ্যাঁরে  ছন্দা বাপের বাড়ি থেকে ফেরেনি ?” আমরা সবাই বলতাম, “ছন্দা
কাকিমা অসুস্থ তাই বাপের বাড়িতেই আছে । সামনের সপ্তাহেই আসবে ।” মা শুনে
আশ্বস্ত হতো । 
আমি খুব মুষড়ে পড়েছিলাম । আমি ছোটকাকিমাকে খুব ভালোবাসতাম । আমার মনে হয়েছিল
মিতা আবার ফিরে এসেছে । ছোটকাকিমা আর নেই এই সত্যিটা মেনে নিতে অনেকদিন সময়
লেগেছিল । 
এই ঘটনার পর পাড়ার লোকেরা বিশ্রী সব কথা বলা শুরু করলো । আমাদের বাড়িটা নাকি
একটি অভিশপ্ত বাড়ি । ঘোষেদের মেজোকর্তা বললো, পরিবারটি একটি অভিশপ্ত পরিবার ।
কেউ কেউ আবার আমাদের বাড়ির নাম দিল সাপবাড়ি । আমরা কিছুতেই বোঝাতে পারলাম না,
দুটি ঘটনাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা । একটির সাথে অপরটির কোন সম্পর্ক নেই । আর তাছাড়া
ঘটনা দুটিও ঘটেছে বাড়ির বাইরে দুটি ভিন্ন জায়গায় । সাপবাড়ি হিসেবে আমাদের বাড়ির
জনপ্রিয়তা এবং পরিচিতি দুটোই সাংঘাতিক ভাবে বেড়ে গেল । পাশাপাশি চলতে লাগলো ডজন
খানেক মনগড়া সাপের গল্প । অদ্ভুত সব ঘটনার চমৎকারিত্ব সে সব গল্পে । 
দোতলায় ছোটকা আর ছোটকাকিমা থাকতো । আমি থাকতাম দোতলার কোণের ঘরটায় । একতলায়
বাবা আর মা । বাকি ঘরদুটো খালিই পড়ে থাকে । ছোটকাকিমা মারা যাওয়ার পর বাড়িটা
আবার শুনসান হয়ে গেছে । নিস্তব্ধতা গ্রাস করতো পুরো বাড়িটাকে । এখন আর ছোটকা
দোতলায় থাকে না । নিচে ড্রয়িং রুমের পাশেই পাকাপোক্ত ভাবে থাকতে শুরু করেছে
। 

রোমাঞ্চকর গল্প

এরই মধ্যে আবার ছোটকাকার বিয়ে দেওয়া নিয়ে কথা শুরু হয়ে গেছে । সবাই বলছে সুবুর
(সুবিনয় চ্যাটার্জি কাকার নাম) কি এমন বয়েস হয়েছে ? সারা জীবনটাই তো পড়ে রয়েছে
। প্রথমটায় ছোটকা রাজি না হলেও পরে শর্তসাপেক্ষে রাজি হয়েছে । কি শর্ত ? শর্ত
হলো বিয়ে করলে সে সরলাকে বিয়ে করবে । কে সরলা ? সরলা সিং হচ্ছে ছোটকার অফিসের
সহকর্মিনী যে কিনা জাতিতে পাঞ্জাবি । বাড়ি আত্মীয় পাড়া প্রতিবেশী গুষ্টিতে কারো
কোন আপত্তি নেই এতে । অতএব কথাবার্তা এগোতে থাকলো । 
                     
            ***
সকাল সাড়ে আটটা হবে । আমি কলেজের জন্য তৈরি হচ্ছি । কাজের দিদি সবে টিফিনবক্সটা
হাতে ধরিয়েছে ব্যাগে রাখার জন্য, নিচ থেকে বাদানুবাদের তীব্র আওয়াজ পেতে থাকলাম
। দরজা খুলে দোতলার বারান্দা থেকে দেখার চেষ্টা করলাম । ঠিক বোঝা যাচ্ছে না,
পুরোটা দেখাও যাচ্ছে না । নিচে নেমে দেখি ছোটকাকা একটি লোককে মারতে উদ্যত ।
যাকে মারতে যাচ্ছে সে নিতান্তই গোবেচারা স্বভাবের লোক । ছেঁড়া জামা পরা
উস্কোখুস্কো মুখভর্তি কাঁচাপাকা দাড়িওয়ালা মধ্যবয়স্ক অপরিচিত লোক ।
ছোটকা লোকটাকে ভাগাতে চাইছে । আর লোকটি কিছুতেই যেতে চাইছে না । শেষটায় ছোটকা
লোকটার ছেঁড়া জামার কলার ধরে হিড় হিড় করে টানতে টানতে মেইন গেটের বাইরে ধাক্কা
দিয়ে বের করে দিল । লোকটা টাল সামলাতে না পেরে পরে গিয়ে নাক দিয়ে রক্ত বের হতে
লাগলো । ছোটকার তাতেও রাগ যায় না । আমি এক তলায় নেমে এসে ছোট কা কে শান্ত করতে
গেলাম । বললাম, “এত রেগে যাচ্ছ কেন ?”
ছোটকা চেঁচাতে লাগলো,  “”আরে এ ব্যাটা নিজেকে বলছে জ্যোতিষী !  আমাকে
ভয় দেখাচ্ছে । বলছে বাড়িতে পূজো না দিলে আরো নাকি সাপের কামড়ে মৃত্যু আছে ।
এবারে নাকি আমি মরবো ।” ছোটকা উত্তেজিত স্বরে বলেই চলছে, “বুজরুকির আর জায়গা
পায়নি ? আমাকে ভয় দেখাচ্ছে ? টাকা এমনি এমনি পাওয়া যায় ! রোজগার করতে হয় না ?”
আমি বললাম,  “শান্ত হও ছোটকা । তোমার অফিস যাওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে ।”
ছোটকা তবু গজগজ করতে থাকলো । কলেজে যাওয়ার সময় দেখলাম বাসস্ট্যান্ডের পাশে একটা
চায়ের দোকানের সামনে সে বিড়ি ফুঁকছে । আমাকে দেখে ফিকফিক করে হাসতে লাগলো ।
পাগল নাকি ? আমার মায়া হলো । পকেট থেকে একশো টাকার একটা নোট বের করে ওর হতে
গুঁজে দিয়ে বললাম,  “ডাক্তার দেখিয়ে নিও । আর এসব লোক ঠকানো ধান্দাবাজি
ছেড়ে কাজ করে খাও ।”
                     
              ***
তৃতীয় মৃত্যুটি ঘটলো চার মাসের মধ্যেই । আমার পার্ট ওয়ান পরীক্ষার এক সপ্তাহ
পরে । ছোটকার ড্রাইভার । শ্যাম নামের এই ছেলেটি ছোটকার মারুতি সেডান টি গত দু
বছর ধরে চালায় । থাকে পাশের পাড়াতে । কাকা ওর উপরে খুব ভরসা করে । অসম্ভব বিনয়ী
ভালো স্বভাবের  শ্যাম ভীষন নিয়ম মেনে চলতো । আজ পর্যন্ত কোনদিনও সে কামাই
করেনি বা ডিউটিতে দেরি করে আসেনি । গাড়িও সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং সার্ভিস
করিয়ে রাখে । আর ছোটকাও শ্যামকে ওর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে বাজার চলতি মইনের থেকে
বেশি টাকাই মাসোহারা দেয় । 
কাকতালীয় ভাবে হোক বা রহস্যজনক ভাবেই হোক শ্যামও মারা গেল সাপের কামড়ে । এবারে
পাড়াপড়শী কি ভাবছে জানিনা । কিন্তু গতকাল সকালে যখন শ্যাম গ্যারেজ থেকে গাড়ি
বের করার জন্য গাড়িতে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট করতে যাবে ঠিক তখনই গাড়ির ভেতরে থাকা
চন্দ্রবোড়া তার পায়ে ছোবল মারে । বিষ এতটাই ঢেলে দেয় যে ছোবল মারার কয়েক
মিনিটের মধ্যে শ্যাম মারা যায় । পাড়ার লোকজন গ্যারেজে ঢুকে সাপটিকে মেরে ফেলে ।
শ্যাম কে নিয়মানুযায়ী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো শুধু ডেথ সার্টিফিকেট নেওয়ার
জন্য । 
কিন্তু রহস্য দানা বাঁধতে থাকলো । এ কোন অভিশাপে এই বাড়ির সদস্য অথবা তাঁদের
সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা একের পর এক সাপের কামড়ে মারা যেতে লাগলো ? বরানগরের মতো
জায়গায় সাপ এলোই বা কোথা থেকে ? মা তো আরো বেশি ভয় পেয়ে কুঁকড়ে রয়েছে কারণ
সেদিন জ্যোতিষী এসে ছোটকাকে বলে গেছিল আরো দুজন সাপের কামড়ে মরবে । তারমধ্যে
একজন তো মারলোই । এবার তাহলে কার পালা ? আমার নয় তো ? অবশ্য জ্যোতিষী বলেছে
এবার নাকি ছোটকার পালা । ছোটকা অবশ্য থোড়াই কেয়ার করে এসব । জ্যোতিষী তোটিষী
কিস্যু বিশ্বাস করে না । কিস্যু মানে না । বললো এটা একটি কাকতালীয় ঘটনা ।
শ্যামকে যে সাপটি কামড়েছে সেটা হয়তো পাড়াতে যে দুটো পুরোনো দিনের পুকুর আছে
সেখান থেকে উঠে এসেছে, জায়গা না পেয়ে গ্যারেজে আশ্রয় নিয়েছিল । বাকিটা শ্যামের
কপাল ।
মা এর মধ্যে ব্রাহ্মণ ডাকিয়ে বাড়িতে মনসা পূজো করিয়ে নিয়েছে । সারা বাড়িতে
শান্তি জল ছিটিয়ে দিয়েছে । 
                     
             ***
কিন্তু এখানেই চমকের শেষ নয় । কাহিনী আরো গড়ালো । জ্যোতিষীর কথা অক্ষরে অক্ষরে
সত্যি প্রমান করে শ্যামের মৃত্যুর এক মাসের মধ্যে ছোটকাকেও সাপ কামড়ালো ।
একতলায় ছোটকার শোয়ার ঘরের দুটো ঘর পাশেই লাইব্রেরি ঘরে । সেটিও একই প্রজাতির
সাপ । যে সাপে শ্যামের মৃত্যু হয়েছিল । আমাদের লাইব্রেরি ঘর সাধারনতঃ বন্ধই
থাকে । সেদিন কি মনে করে অনেকদিন পর সন্ধ্যেয় ছোটকা খুলে ভেতরে ঢুকতে যাবে, ঠিক
তক্ষুনি দরজার পাশে ঘাপটি মেরে থাকা চন্দ্রবোড়ার  এক ছোবলে…..! ! 
ছোটকার মৃত্যুতে বাড়িতে বিশাল শোকের ছায়া নেমে এসেছিল ঠিকই কিন্তু তার থেকে
বেশি সৃষ্টি হলো আতংকের । বাবা আর মা সাপের ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকতো । সাপের ভয়ে
সারাবাড়িতে আরোও বেশি বেশি আলো সারারাত ধরে জ্বালিয়ে রাখা হতো । ছোটকার শ্রাদ্ধ
শান্তির পর বেশ কয়েক বার পূজো আচ্চা হলো । মা মনসার পূজো । আমার ভয় হতো না । কে
জানে কেন ?  কারণ হতে পারে আমি ইদানিং ছোটকাকাকে পছন্দ করছিলাম না ।
ছোটকাকিমার মৃত্যুরহস্য আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল । ছোটকাকিমার মৃত্যু আমার মনে
এক অশান্তির বীজ বপন করেছিল । আমি ছটফট করতাম । 
                     
              ***
সবে অনার্সের পার্ট টু পরীক্ষা শেষ হয়েছে । স্বাতী দিল্লি থেকে ছুটিতে এসে
এবারে একটু বেশি দিনই ছিল কলকাতায় । ক্লাস শুরু হয়ে গেছে তাও যায়নি । আমি
জিজ্ঞেস করেছিলাম । কিন্তু উত্তরটা আমার ঠিক মনঃপূত হয়নি । জিজ্ঞেস করায় বলেছে
ওর মা অসুস্থ তাই যেতে দেরি হচ্ছে । কিন্তু অন্য উৎস থেকে জেনেছি রুমি কাকিমা
সুস্থই আছেন । 
কাকতালীয় ভাবে শ্যাম মারা যাওয়ার পরের দিন স্বাতী কলকাতায় এসেছিল । এবার ছোটকা
মারা যাওয়ায় চার দিন পরে এলো । কলকাতায় এলে স্বাতী কিছু সময় আমার সাথে কাটায় ।
বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে হওয়ায় কলকাতায় এলে ওর আরো অনেক কাজ থাকে । শ্যামল কাকু
রিটায়ার্ড আর রুমি কাকিমা ডায়াবেটিসের রুগী । তা সত্বেও সময় বের করে স্বাতী
আমাদের বাড়িতে আসে । বিকেলটা, সন্ধ্যেটা কাটিয়ে যায় । ওর যত লোভ আমার ইংরেজি
উপন্যাসগুলোর দিকে । প্রত্যেকবারই দুতিনটে বই সে নিয়ে যাবেই যাবে । তারপর
সেগুলো চিরস্থায়ী ভাবে ওর বইয়ের সেলফে স্থান করে নেয় । আমি কপট রাগ করি । না
দিতে চাওয়ার ভান করি । কিন্তু নিয়ে গেলে খুশি হই । স্বাতীরা  আমাদের পাড়ায়
থাকে । ও আমার ছোটবেলার বন্ধু । বন্ধুত্ব প্রেম পর্যন্ত গড়িয়েছিল । কিন্তু যেই
স্বাতী সাংবাদিকতা নিয়ে পড়ার জন্য দিল্লি গেল সম্পর্ক ফিকে হতে লাগলো । ও আমাকে
এড়িয়ে চলতে শুরু করলো । আমার মা এবং বাবা দুজনেই স্বাতীকে পছন্দ করে । কিন্তু
আমি জানি স্বাতী আমাকে বন্ধুর বেশি আর কিছু ভাবে না আজকাল।
কাল স্বাতী ফোন করেছিল । বলেছিল আজ সকালে আসবে । আজ বিকেলের রাজধানী এক্সপ্রেসে
ওর দিল্লি ফিরে যাওয়ার কথা । আমি সকাল থেকে আমার ডায়রিটা খুঁজে পাচ্ছি না ।
অনেক কথা জমে গেছে, সেগুলো তো লিখতে হবে । অথচ তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সেটিকে
পাচ্ছি না । দু দুবার খুঁজেছি আলমারি, টেবিল, বইয়ের সমস্ত সেল্ফ । আর একবার
খুঁজতে যাবো এমন সময় স্বাতী দরজা ঠেলে আমার ঘরে ঢুকলো । স্বাতীর চেহারা
বিধ্বস্ত, শুকনো এবং ম্লান । আমি বললাম,  “কিরে এই কদিন এলিনা যে বড় !
কোথায় ছিলি ?”
স্বাতী কোন উত্তর না দিয়ে পড়ার টেবিলের সামনে রাখা চেয়ারে গিয়ে বসলো । উদাস হয়ে
কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে রইলো অনেকক্ষন । আমি বুঝতে পারছিলাম কোথায় একটা ছন্দপতন
ঘটেছে । স্বাতীর এবারের ব্যাবহার মোটেও স্বাভাবিক নয় । ঘন্টা খানেক এভাবেই বসে
থাকার পর, কাঠের চেয়ারের হাতল নখ দিয়ে আঁচড় কাটতে কাটতে কড়িকাঠের দিকে দৃষ্টি
স্থির রেখে বললো, “বাপ্পা আমার সন্দেহ সত্যিই হলো ।”  আমি বললাম, “মানে ?
কিসের সন্দেহ ? আমি তো মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না ।” স্বাতী বললো, 
“ছোটকা আর শ্যামের মৃত্যুর কারণ তুই বাপ্পা । আমি পরশু এসেছিলাম । তোর সেল্ফ
থেকে টুইনকল খান্নার মিসেস ফানিবোনস আর সুধা মূর্তির দ্য সার্পেন্টস রিভেঞ্জ
নিয়ে গেছিলাম । সঙ্গে নিয়ে গেছিলাম তোর ডায়রিটা । ওটা তুই আলমারিতে লুকিয়ে
রেখেছিলি ।”
আমার সব জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল । বুঝলাম কেন ডায়রি টা খুঁজে পাচ্ছিলাম না ।
তার মানে স্বাতী সব জেনে গেছে । কিন্তু আমি স্বাভাবিক থাকলাম । স্বাতী বললো,
“আমি সব পড়েছি । যে জ্যোতিষী ছোটকার কাছে এসেছিল সে কোন জ্যোতিষী নয় । সে
বনগাঁর প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকে ।খগেন মুর্মু পেশায় সাপুড়ে । বনে বাদাড়ে 
সাপ ধরে বেড়ায়  । তুই  আঁচ করেছিলি  ওর কোন ভূমিকা আছে ছন্দা
কাকিমার মৃত্যুতে । কাকার মোবাইল ঘেঁটে তুই খগেন মুর্মুর মোবাইল নম্বর জোগাড়
করিস । খগেনকে ফোন করে জানতে পারিস একবছর আগে একটা চন্দ্রবোড়া সে কাকাকে
সাপ্লাই করেছে । তুই আন্দাজ করেছিলি ওই সাপ দিয়েই ছোটকা কাকিমাকে ফুলডুঙ্গরি
পাহাড়ে মেরে দেয় । কারণ ছোটকার অ্যাফেয়ার্স হয়ে গিয়েছিল নিজের অফিসেরই সরলা সিং
য়ের সাথে । ছোটকাকে সাহায্য করে শ্যাম । তাই তুই খগেন মূর্মূর কাছ থেকে দুটো
চন্দ্রবোড়া কিনে শ্যামকে গ্যারেজে আর ছোটকাকে লাইব্রেরি ঘরে মারলি । তুই ছন্দা
কাকিমার হত্যা মেনে নিতে পারিস নি ।” 
এই পর্যন্ত এক নিঃশ্বাসে বলে স্বাতী থামলো । তারপর আবার বলে উঠলো, 
“কিন্তু তুই এসব করতে গেলি কেন ? নিজের হাতে আইন নিতে গেলি কেন ?”
“কারণ আইন প্রমানের অভাবে কোন দিনই ছোটকাকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারতো না ।” আমি
চোয়াল শক্ত করে বললাম । 

রোমাঞ্চকর রহস্য গোয়েন্দা গল্প

স্বাতী চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত পায়চারি করতে
লাগলো । বললো,  “তুই সারেন্ডার কর বাপ্পা । তুই কাজটা ঠিক করিসনি । আইনের
চোখে তুই অপরাধী । খুনি ।”
একটু থেমে বলল,  “তোর লেখা ডায়রির পাতাগুলো আমি সব ছিঁড়ে ফেলেছি । কিন্তু
আমি চাই তুই তোর অপরাধ স্বীকার কর । ছোটবেলা থেকে তোকে দেখে আসছি । শান্তশিষ্ট
মেধাবী বাপ্পা তুই যে এতোটা ভয়ংকর আর ঠান্ডা মাথার খুনি কে বলবে তোকে দেখে ।
তুই থানায় যা । সাপ নিয়ে আর খেলিস না । তুই না গেলে আমি থানায় রিপোর্ট করতে
বাধ্য থাকবো ।”
স্বাতী যেখানে বসে আছে তার পেছন দিকে দেয়াল ঘেঁসে একটা আগেকার দিনের বড় সেগুন
কাঠের টেবিল রাখা আছে । ওতে আমি যত অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখি । কিছু
ম্যাগাজিন,  একটা জুতোর বাক্স একটা পুরোনো ট্রানজিস্টার কয়েকটা জলের
গ্লাস, একটা ফ্লাস্ক আর ঢাকনা সমেত একটা ফলের ঝুড়ি অবিন্যস্ত ভাবে রাখা আছে ।
স্বাতী চেয়ারে মাথা হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে যাচ্ছে,  “তুই
অপরাধী ।  তুই খুনি । তুই আত্মসমর্পন কর বাপ্পা ।” আমি ফলের ঝুড়িটা টেবিল
থেকে নিয়ে নিঃশব্দে পেছন দিক দিয়ে গিয়ে চেয়ারের নিচে স্বাতীর দুই পায়ের মাঝখানে
রেখে ঢাকনাটা খুলে দিলাম । কিছু বোঝার আগেই চন্দ্রবোড়াটা ঝুড়ি থেকে বেরিয়ে
স্বাতীর ডান পায়ের গোড়ালিতে মোক্ষম একটা ছোবল মারলো  । পায়ে দংশনের
তীক্ষ্ণ জ্বালায় নিচে তাকিয়ে স্বাতী বিস্ফারিত নেত্রে দেখতে পেল চন্দ্রবোড়াটা
এঁকেবেঁকে সর্পিল গতিতে দরজার দিকে এগোচ্ছে । স্বাতী এতটাই ঘাবড়ে গেছে যে মুখ
দিয়ে দুর্বোধ্য কিছু শব্দ আর গোঁ গোঁ আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই বেরোল না । সাপটা
দরজার কাছে গিয়ে বেরোনোর পথ না পেয়ে মেঝেতেই কুন্ডলি পাকিয়ে চুপ করে গেল ।
স্বাতীর ঘনঘন নিঃশ্বাস পড়ছে । বুঝতে পারছি শ্বাসকষ্ট হচ্ছে । একবার চেয়ার ছেড়ে
ওঠার চেষ্টা করলো । কিন্তু পারলো না আবার বসে পড়লো । আমি স্বাতীর কানের কাছে
মুখ নিয়ে গিয়ে হিসহিস করে বললাম,  “আমার কিছু করার ছিলোনা রে । খগেনের
থেকে  একটা এক্সট্রা চন্দ্রবোড়া কেনা হয়ে গিয়েছিল । ঘরে পুষতে অসুবিধে
হচ্ছিল । ভেবেছিলাম মেরে ফেলবো । কিন্তু কে বলতে পারে কখন কোন জিনিস কি কাজে
লেগে যায় ? আমাকে ক্ষমা করে দিস স্বাতী ।” স্বাতী ইতিমধ্যে নেতিয়ে পড়েছে ।
অস্পষ্ট আর জড়ানো গলায় বললো, “তুই শেষে আমাকেও…..? ”
আমি পেপারওয়েট নিশানা করে ছুঁড়ে মারলাম সাপটার মাথা লক্ষ্য করে । অব্যর্থ
নিশানা । মাথা থেঁতলে গেল । স্বাতীকে চ্যাংদোলা করে পেছনের সিঁড়ি দিয়ে নিচে
নিয়ে গিয়ে বাগানে শুইয়ে রাখলাম পাশে ছিন্নভিন্ন মাথা সমেত চন্দ্রবোড়ার লাশ ।
বাবা আর মাকে খবর দিলাম, “বাগানে স্বাতীকে সাপ কামড়েছে । আমি ডাক্তার ডাকছি ।”
                     
              ***
বিকেলে পাড়ায় রটে গেল: সাপবাড়িতে সাপের কামড়ে আর একটি মৃত্যু । বিস্তারিত খবরে
বলা হলো বাপ্পার বান্ধবী স্বাতী বাপ্পাদের বাড়িতে গেলে তাদের বাগানে সাপের
কামড়ে স্বাতীর মৃত্যু হয় । যদিও বাপ্পা সাপটাকে পাথর ছুঁড়ে মারতে সক্ষম হয় ।
কিন্ত আলোচ্য বিষয় হলো এরপর কে ? আমি মুচকি হেসে মনে মনে বললাম কেউ না ।
আরো পড়ুন,
Share This Article
Leave a comment

Adblock Detected!

Our website is made possible by displaying online advertisements to our visitors. Please consider supporting us by whitelisting our website.